বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতুতে প্রথমবার চলল ট্রেন, বাণিজ্যিক যাত্রা জানুয়ারিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর উপর নির্মিত দেশের বৃহৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুতে প্রথমবারের মত পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে এর বানিজ্যিক যাত্রা শুরু হবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর এই রেল সেতুতে ট্রেন চলাচল করায় টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের দুই পাড়ের মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বসিত দেখা গিয়েছে।

 

মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) সেতু ট্রায়াল ট্রেন দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর অংশ থেকে পশ্চিমপাড়ের দিকে ট্রেনটি ছেড়ে যায় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে। ট্রেনটি সেতু পার হতে সময় লেগেছে ২০ মিনিট। প্রথমে ১০ কিলোমিটার বেগে চলাচল করলেও পরে ৪০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন দুটি চলাচল করে। পশ্চিমপাড়ের সিরাজগঞ্জ অংশ থেকে আরেকটি ট্রেন টাঙ্গাইলের দিকে ছেড়ে আসে একই সময় নিয়ে। এসময় ট্রায়াল ট্রেনের চালক ছিলেন, মাইনুল ইসলাম এবং সহকারী চালক ছিলেন আব্দুস সালাম।

 

ট্রেন পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন, প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, প্রকল্প ব্যবস্থাপক মার্ক হবি, নির্মাণ ব্যবস্থাপক মি. ইপোমাফসু, ট্রাক এক্সপার্ট নাকাজিমা, নিরাপত্তা প্রকৌশলী কামরুল হাসান চৌধুরী প্রমুখ।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার দেশের অন্যতম বৃহৎ বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০ মিটার উত্তরে যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর সমস্ত কর্মযজ্ঞের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে টাঙ্গাইল প্রান্ত থেকে। সেতুতে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব রেলস্টেশন ও বঙ্গবন্ধু সেতুপশ্চিম রেলস্টেশন আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সেতুটি সম্পূর্ন ইস্পাত দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ৫০টি পিলারের কংক্রিটের ওপর রেলপথ বসানো হয়েছে। সেতুটিতে কোন স্লিপার নেই। এতে রয়েছে ডুয়েল গেজ ডাবল-ট্র্যাক রেলপথ। জানুয়ারিতে ট্রেন চলাচলের জন্য শেষ মুহুর্তের কাজ করা হচ্ছে।

 

ট্রায়াল ট্রেনের চালক মইনুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জের মানুষ হিসেবে আমি গর্বিত আজকে দেশের বৃহৎ সেতুতে ট্রায়াল ট্রেন চালানোর জন্য। প্রথম থেকেই ইচ্ছে ছিল সেতুর উপর প্রথম ট্রেনটি আমিই চালাবো সেটা ট্রায়াল বা উদ্বোধনের সময়। এরফলে আমার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে আমিই প্রথম নতুন এই রেল সেতুতে ট্রেন চালালাম।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান জানান, রেল সেতুর মুল কাজ শেষ হওয়ার পর এটার মেজারমেন্ট, ইফেক্ট, প্যারামিটারসহ বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য ট্রায়াল ট্রেন দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করেছে। এটা প্রাথমিক টেষ্টট্রাম। ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বানিজ্যিকভাবে সেতুতে ট্রেন চলাচল চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের এই দীর্ঘতম রেল সেতু দিয়ে বিরতিহীনভাবে কমপক্ষে ৮৮টি ট্রেন দ্রুতগতিতে সেতু পারাপার হতে পারবে। এছাড়া, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের সেতুর পূর্ব প্রান্তে নতুন রেল স্টেশনের কাজ প্রায় সম্পন্ন, এবং সিরাজগঞ্জের পশ্চিম প্রান্তের রেল স্টেশনের কাজও প্রায় শেষের দিকে। বর্তমানে সেতু নির্মাণ শ্রমিকরা রঙ-তুলি ও ঘষামাঝার কাজ করছেন।

 

নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু রেল সেতু সাধারণ ট্রেন ছাড়াও দ্রুতগতির (হাইস্পিড) ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সেতুতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। তবে উদ্বোধনের প্রথম বছরে সাধারণত ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করবে। এতে ক্রসিংয়ের সমস্যা হবে না, ফলে সময় সাশ্রয় হবে ২০ থেকে ৩০ মিনিট।

 

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের নকশা প্রণয়নসহ সেতুর নির্মাণ ব্যয় প্রথমে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এর মেয়াদ ২ বছর বাড়ানো হয়। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ দেশীয় অর্থায়ন এবং ৭২ দশমিক ৪০ শতাংশ জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ঋণ দিয়েছে।

 

ওজি/প্রটা