মতামত ডেস্ক, অনলাইন: আজকাল প্রায়ই গণমাধ্যমে যৌন হয়রানির খবর প্রকাশ হতে দেখা যায়। পরিবারে, রাস্তা-ঘাটে, গণপরিবহণে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়- কোথাও নারী নিরাপদ নয়। কখনো আত্মীয়-স্বজন, কখনো বন্ধু-সহপাঠী, কখনো শিক্ষক বা সহকর্মীর দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী। এ ব্যাপারে প্রণীত সমস্ত আইন যেন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একের পর এক যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যৌন হয়রানির সব ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় না।
সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হয়রানির শিকার নারী নিজেই তা প্রকাশ করেন না। হাতেগোনা কিছু ঘটনা প্রকাশ হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো প্রকাশিত সব ঘটনার যথাযথ বিচার হয় না। সেগুলো নিয়ে কিছুদিন আলোচনা চলে। আবার নতুন ঘটনা ঘটলে পুরোনো ঘটনা চাপা পড়ে যায়। এ বাস্তবতা থেকেই যৌন হয়রানির শিকার অনেক নারী প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। যারা সাহস করে মুখ খোলেন তারাও সামাজিক অমর্যাদার শিকার হন। তার মানে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাও নির্যাতিত নারীর পক্ষে নয়।
সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে অবন্তিকা নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। অবন্তিকা কর্তৃপক্ষ বরাবরে অভিযোগ করেছিল। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস বিষয়টির গুরুত্ব দেয়নি। ফলে অভিযোগ করার পর নানা রকম নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে তাকে। আত্মহত্যার পর প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছে। জীবিত অবন্তিকা এ শাস্তি দেখলে আশ্বস্ত হতে পারতো। কিন্তু অবন্তিকা আর ফিরে আসবে না। ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে প্রথমে পাত্তা পায়নি।
পরে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে একই ঘটনা। প্রথমে গুরুত্ব পায়নি বিষয়টি। তারপর তদন্ত ও বিচারের দাবিতে বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে এবং সকল প্রকার একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিলে অভিযুক্ত শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র হলে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্যণের অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রনেতা ও তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে।
রাজধানীর একটি সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দেখা গেছে, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের তুমুল বিক্ষোভ। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এ রকম অসংখ্য যৌন হয়রানির উদাহরণ দেওয়া যাবে- যেগুলো বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যৌন নির্যাতনের আখড়ায় পরিণত হতে চলেছে। এ ব্যাপারে সচেতন মহলের উদ্বেগ হলো, রাজনৈতিক বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকদের নিয়োগ ও তাঁদের পকেটকমিটির দ্বারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আদর্শহীনতার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে না তো!
নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানির নানা দিক নিয়ে নারীবাদী সংগঠনগুলো গবেষণা করে থাকে। যেসব গবেষণা থেকে জানা যায় নারীর প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আলীম ‘বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরুষতান্ত্রিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধের কৌশল’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণায় তিনি ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২০০ নারী শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নেন।
উক্ত গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, ৫৬ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী তাদের সহপাঠিদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। ২৪ শতাংশ সিনিয়র ও জুনিয়রদের দ্বারা, ১১ শতাংশ বহিরাগত ও ৯ শতাংশ শিক্ষকদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। উক্ত গবেষণা থেকে আরো জানা যায়, যৌন হয়রানির ঘটনায় মাত্র ১০ শতাংশ ছাত্রী অভিযোগ করেন। ৯০ শতাংশ ছাত্রী ন্যায়বিচার না পাওয়া ও অধিক নির্যাতনের শিকার হতে পারেন ভেবে কোনো অভিযোগ করেন না। অধ্যাপক আবদুল আলীমের গবেষণা আমাদের দারুণভাবে শঙ্কিত করে তোলে।
গবেষক অধ্যাপক আবদুল আলীম বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণাটি হলেও একই সময়ে আমি আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলে জানতে পেরেছি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও একই রকম। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরো খারাপ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় যে- দিনদিন পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকেই যাচ্ছে।
অধ্যাপক আলীমের কথায় জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা যৌন হয়রানির সঙ্গে জড়িত তারা রাজনৈতিকভাবে কিংবা অন্য কোনোভাবে প্রভাবশালী। ফলে তাদের রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলের কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকে। এতে করে অনেক ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক ঘটনার বিচার হয় না। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে মুখ খুলতে না পারে তাহলে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের চিত্র আরো ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক। তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে সমাজ? নারীর ক্ষমতায়ন কি নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না? নাকি পুরুষতন্ত্রের নৈতিক অবক্ষয় এতটাই তলানিতে নেমে গেছে যে, সেখানে নীতি-আদর্শের কোনো আলোই নেই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট দিবে না, শিক্ষার্থীর আদর্শিক ও মানবিক মূল্যবোধেরও বিকাশ ঘটাবে- এটা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সে আদর্শিক অবস্থানে দেখা যাচ্ছে না। নীতি-আদর্শ, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে যেভাবে পারে যৌনতার স্বাদ নিতে মরিয়া হয়ে উঠছে। এ ব্যাপারে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে থোরাই কেয়ার করা হচ্ছে। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, যিনি শিক্ষক তিনি নিজেও তার ছাত্রীর প্রতি যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করছেন।
একজন শিক্ষক যখন যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করেন তখন তিনি আর শিক্ষক থাকেন না। তখন তিনি যৌন নিপীড়ক এক ঘৃণ্য অপরাধীতে পরিণত হন। ফলে তার শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যৌন হয়রানির শিকার নারীরাই নানাভাবে শাস্তি পেয়ে যায়। যৌন হয়রানির শিকার নারীর গায়ে চরিত্রহীনতার তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঐ নারী শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়; সামাজিক ও মানসিক নির্যাতনও ভোগ করেন। যারা সাহসী তারা প্রতিবাদ করে। বাকিরা নীরবে সয়ে যায় কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যার পর অনেক শিক্ষার্থীর সুইসাইড নোট থেকে জানা যায় যে, ঐ নারীটি দিনের পর দিন যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন শিকার হচ্ছিলো।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বিষয়ে প্লান ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ ২০২১ সালে ‘চ্যালেঞ্জিং ফিয়ার অব ভায়োলেন্স’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জনসমাগমের মধ্যে ৮১ ভাগ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠী ও শিক্ষকদের দ্বারা শারীরিক ও নানা ধরনের মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ৭৪ শতাংশ নারী। ভয়াবহ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। বিদ্যমান আইনগত ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
এ ব্যাপারে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি বাদী হয়ে ২০০৮ সালের ৭ই আগস্ট একটি জনস্বার্থমূলক মামলা করেছিল। মামলার বিষয় ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ। মামলার শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৪ই মে মহামান্য হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধসহ নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ এবং নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠায় একটি যুগান্তকারী রায় দেন।
হাইকোর্টের সে রায়ের পর সময় পেরিয়ে গেছে দেড় দশক। কোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৯ সালের ২৭শে মে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করেছিল। আইনগত এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বেড়েই চলেছে। বিষয়টি একদিকে নারীর প্রতি সহিংসতা বা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অন্যদিকে চরম সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র।
সে কারণে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি তেমনি পুরুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনটাও জরুরি। মানসিক পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের কাউন্সেলিং করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের ভর্তিপরবর্তী সময়ে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যাতে তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা যায়।
আর একটি বিষয় হলো যৌন হয়রানিমূলক প্রতিটি ঘটনার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে স্মার্ট নাগরিক তথা দায়িত্বশীল ও মানবিক জাতি গঠনের কারখানা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না।
আলী রেজা-
কলাম লেখক ও পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
