ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বাংলা বা পূর্ববঙ্গ নামক ভূখণ্ডটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানি হওয়ার ফলে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা নানা বৈষম্যের কবলে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তান কৃষি প্রধান হওয়ার ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামালের একটি বড় অংশের যোগানদার ছিল পূর্বপাকিস্তান। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের হাতে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচামাল দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান শিল্পসমৃদ্ধ হতে থাকে। আর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়তে থাকে পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭- এর দেশভাগের পরপরই পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষ বুঝতে পারে প্রকৃত স্বাধীনতা তারা পায় নি। ঔপনিবেশিক শোষণের আদলেই আবার নব্য ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তেই থাকে।
প্রথমেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে জাতিগত সংকটের উদ্ভব হয়। হিন্দু-মুসলিম দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল এবং বাঙালি-অবাঙালি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে জাতিগত আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে পাকিস্তানের পূর্ব অংশের বাঙালিরা প্রতিবাদ করে। এই প্রতিবাদ ছিল যথার্থ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের বিমাতাসুলভ আচরণ চলতেই থাকে। কিন্তু সকল প্রকার শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করে ভাষা আন্দোলনের দুই দশকের মাথায় ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি অর্জন করে হাজার বছরের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। হাজার বছর বাঙালি জাতি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর অধীনে থাকলেও জাতিসত্ত্বার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছে বাঙালি সর্বকালে।
- তাই বাঙালির দেশপ্রেম ছিল অতল অসীম। দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করার নজির দেখিয়েছে বাঙালি জাতির অগণিত সূর্যসন্তানেরা। এই দেশপ্রেম ও দেশের জন্য আত্ম্যোৎসর্গের গৌরবগাঁথা রচনা করেছেন আমাদের কবি-সাহিত্যিকগণ। গানে আর কবিতায় মিশে আছে বাঙালির জনজীবন, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের ইতিহাস। অগণিত লোককবি নির্মাণ করে গেছেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সৌধ। মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার জনজীবন ও সংস্কৃতিকে উপজীব্য করে যারা অসংখ্য কালজয়ী গান লিখে অমরত্ব লাভ করেছেন গীতিকবি লোকমান হোসেন ফকির (১৯৩৪-১৯৯১খ্রি.) তাদেরই একজন।
টাঙ্গাইল জেলাধীন ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল গ্রামের সম্ভ্রান্ত ফকির পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আলহাজ মমতাজ উদ্দিন ফকির ও মাতা কছিরন বেগম। জন্মের পর থেকে শিশু লোকমান বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে পারিবারিক পরিমণ্ডলেই বেড়ে উঠেছিলেন। গাঁয়ের উদার প্রকৃতি, জনজীবন ও ধর্মীয় আবহে কাটতো তার শৈশবের দিনগুলো। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর বয়সীবৃক্ষের ছায়ার মায়াঘেরা পল্লীপ্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা লোকমান ফকির তাঁর আত্মপরিচয়, জীবনবোধ গঠন, ভালো লাগা, মন্দ লাগা ও সুরসাধনার বিষয়ে অবলীলায় বলেছেন তাঁর মনের কথা:
- পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। হাট-বাজার, বিদ্যালয়, ডাকঘর, নায়েববাড়ী, মসজিদ, মন্দির, নাটশালাÑ সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানই আছে আমার গাঁয়ে। যমুনা-ধলেশ্বরীর পলিবিধৌত উন্নত কৃষিপ্রধান আমার গ্রামে হিন্দু মুসলমানের সৌহার্দ্ধে লেখাপড়া, খেলাধূলা, গান বাজনা, যাত্রা-নাটকের দৈনন্দিন আসর জমতো। জন্মলগ্ন থেকেই লালিত হয়েছি গ্রামবাংলার জারি সারি ভাটিয়ালি সুরের মাঝখানে। ঘরে ছিলেন সুরেলা দাদী। আমার সঙ্গীতে হাতে খড়ি তাঁর কাছেই। চাচা, বাবা-মা এবং বড় ভাই প্রেেত্যকেই সঙ্গীত পিপাসু এবং আমার উৎসাহদাতা। বিশেষ করে বড় ভাই মকবুল হোসেন ফকির এবং মেঝো ভাই আফাজউদ্দিন ফকির আমাকে সর্বদাই ব্যস্ত রাখতে চাইতেন সঙ্গীত সাধনায়।
গ্রামবাংলার অনুপম সৌন্দর্য্য, গাঁয়ের মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা, কাকলী-মুখর সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, সাঝের বিচিত্র আবেগ অনুভূতি এবং মৌসুমী ঋতুর বৈচিত্র্যময় গ্রাম্য জীবন আমাকে উদ্বেলিত করতো আন্দোলিত করতো। আজো করেÑ যতোদিন বাঁচবো ততোদিনই করবে। গ্রামবাংলা আমার জীবন, স্বপ্ন এবং সাধনা। আমার গীতিকবিতায় তাই গ্রামের প্রাধান্য বেশি এবং আমার সুরেও গ্রামবাংলার প্রচলিত সুরের আছর। আমার ভীষণ ভালো লাগে লোক সঙ্গীতের সোনার তরীতে ভাসতে।
লোকমান ফকির জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতে। ত্রিশের কবিরা তখন নতুন কাব্যভাষা নির্মাণের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নতুন যুগ সৃষ্টিতে মগ্ন। পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত পাঁচ কবি রবীন্দ্র বলয় থেকে বের হয়ে এসে বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। চল্লিশে গণজাগরণ, নাগরিক সংকট, শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনায় সমৃদ্ধ মানবিক কবিতার নির্মিতি কবিতার ভাব ও ভাষাকে বদলে দিচ্ছে। ভারতবিভক্তির এক বছর যেতে না যেতেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দেখা দিয়েছে জাতীয় সংকট। এই ভাষা আন্দোলন ও একুশের চেতনা নিয়ে লোকমান হোসেন ফকির রচনা করেছেন অনেক কালজয়ী গান।
‘মোরা প্রাণ দিয়ে মাগো তোমারে ডাকার অধিকার করে নিয়েছি’ গানের মাধ্যমে সেই বায়ান্ন থেকেই সরবে পথচলা শুরু করে গীতিকবিতা তথা গানের বিভিন্ন অঙ্গনে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পদচারনা করে নিজেকে খ্যাতির শীর্ষে উন্নীত করেছেন। প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নারীর রূপ ও স্বভাব, মনের বিচিত্র অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ ও খেয়ালি মনের বিচিত্র ভাবনা নিয়ে অসংখ্য আধুনিক গান রচনা করেছেন তিনি। লোকমান হোসেন ফকিরের বেশকিছু জনপ্রিয় ছড়াগান শিশুকিশোরদের মুগ্ধ করে। শিক্ষামূলক, লোকঐতিহ্যভিত্তিক ও সামাজিক-পারিবারিক সেন্টিমেন্টের বহি:প্রকাশ এ সব ছড়া গান এখনো জনপ্রিয়। নানা প্রজাতির পাখি এক সময় গ্রামীণ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ ছিল। বন বাদারে, বাড়ির আঙিনায় নানা প্রজাতির পাখিদের আনাগোনা আর ডাকাডাকি চলতো রাতদিন। এখন আগের মতো পাখিদের আনাগোনা চোখে পড়ে না। তাই এ প্রজন্মের শিশুকিশোরদের উদ্দেশ্য করে একটি লোকছড়ার আদলে তিনি রচনা করলেন একটি ছড়াগান :
আতা গাছে তোতা পাখী
ডালিম গাছে মউ
তোমরা শুধু গল্প শোন
দেখনিতো কেউ।
জামের ডালে ময়না পাখী
নীমের ডালে টিয়া
আমের ডালে ঘুঘুডাকে
পিউ কাঁহা পাপিয়া
হিজল ডালে দুপুর মাতায়
বউ কথা কও বউ।
বড়ুই গাছে চড়ুই পাখী
বাবুই খেজুর গাছে
ঘরের চালে জোড়ায় জোড়ায়
পায়রা বাকুম নাচে
সে নাচ দেখে কাক-শালিকের
মনে খুশির ঢেউ। (২৪১)
এভাবে ফুল, পাখি, বৃক্ষ, খাল, বিল, নদী ও গ্রামীণ বাংলার যাপিত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে লোকমান ফকিরের ছড়া গানে। লোককবিরা বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং সযত্নে তুলে দেন পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। পল্লী বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জনজীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে লোককবিদের রচিত এ সব গান গ্রামীণ মানুষের কাছে পল্লীগীতি নামে পরিচিত। লোকমান ফকির পল্লীপ্রকৃতি, পল্লীর জনজীবন ও লোকসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে অনেক লোকগান বা পল্লীগান রচনা করেছেন। এ সব গানে পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতি, সম্পর্কের জটিলতা, প্রেম-বিরহ ও প্রণয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার ছাড়াও পল্লী বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। লোকমান হোসেন ফকিরের জনপ্রিয় পল্লীগানের কিছু পংক্তি :
অঘ্রাণেরই সাত সকালে
ভাঙ্গে সবার ঘুম
কাস্তে হাতে কৃষাণ ছোটে
ফসল কাটার ধুম। (২৫৭)
আসমান জুইরা কালো মেঘ
ডাকছে গুরু গুরু
বয়না বাতাস থমথমে ভাব
মনটা উড়ু উড়ু। (২৬০)
এই পোড়া মন আগের পোড়া
পুড়বে না আর সই
মিছেই পোড়ার আয়োজন আর
করিস না লো সই। (২৬২)
কতই জ্বালা দিলারে বন্ধু
ফুলের মালা লইয়া
সারা জীবন থাকবো তোমার
সকল জ্বালা সইয়া। (২৬৪)
জাল নিয়া আয় আনরে খালুই
ও জেলেনী আয় রে আয়
মাছ ধরিবার লগন বয়ে যায়। (২৬৮)
ঢেউ দিও না ঢেউ দিও না
ঢেউ দিও না জলে
ওলো প্রাণ সজনী
আর জলে ঢেউ দিও না। (২৭০)
নতুন ধানের চিড়া দিমু
নতুন ধানের খই
নতুন ধানের ভাত রেধেছি
পড়শীরা সব কই
গেলি কই পড়শীরা সব কই। (২৭৮)
রঙিলা বন্ধুরে
লুকাইলি কোন দূরে
তোর লাগি চোখের ঘুম নাই
তুই কি দাগা দিলি প্রাণে
মইলাম প্রেম আগুনে
কই গিয়া যে পরানটা জুড়াই। (২৮৬)
লোকমান হোসেন ফকিরের গানের ভুবন সমৃদ্ধ হয়েছে নানামাত্রিক গানে। অসংখ্য আধুনিক গান ও পল্লীগানের পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন ভিন্ন মাত্রার কিছু মরমী গান। ঈশ্বরভক্তি, আধ্যাত্মিক চিন্তা ও পারলৌকিক জীবনকেন্দ্রিক এসব ধর্মীয় অনুভূতিজাত গানগুলো মূলত ইসলামি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। ইসলামি গানের অমর স্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজে গানের আবেদন ও কদর সৃষ্টি করেছিলেন ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে গান লিখে। আব্বাসউদ্দিন, আবদুল আলীমসহ বেশকিছু শিল্পীর কণ্ঠে ইসলামি গান গীত হলে মুসলমান সমাজ গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে যারা মরমী গানের মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন লোকমান ফকির তাদেরও একজন। লোকমান ফকির ইসলামি গানে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছিলেন। মরমী বা ইসলামি ধ্যান ধারণা ও খোদাভক্তি নিয়ে রচিত লোকমান হোসেন ফকিরের কিছু গানের অংশবিশেষ প্রসঙ্গক্রমে উদ্ধৃত হলো :
আল্লাহ তোমায় ডাকি আমি
আমার সকল কাজে
চাই হারাতে পলে পলে
তোমার নামের মাঝে। (২৮৯)
লাজ শরমের কিইবা আছে
সবই প্রকাশ তোমার কাছে
অকারণের সব আবরণ
চাই তো আমি খুলতে।
স্রষ্টা তুমি আমি সৃষ্টি
চাইগো তোমার শুভদৃষ্টি
মিষ্টি তোমার নামের জামে
মাতাল হয়ে টলতে। (২৯৩)
কারিগরের কাণ্ড দেইখা অবাক হইয়া যাই
কতই জিনিস বানাইছে তার গড়নে মিল নাই। (২৯৫)
যা দেখো না তাতে যদি ঈমান নাহি আসে
ক্যান তবে একিন আনো খোসবু আর বাতাসে।
বাতাস যেমন যায় না দেখা খোসবু যেমন ফুলে
একটুখানি ভাবরে মন দিব্য চক্ষু খুলে। (২৯৭)
একা এলি একাই যাবি
কোথায় যাবি কি যে পাবি
দেখলি না তোর প্রভুর দাবী
একটু ভাবিয়া। (৩০৪)
যে দিলো তোর চোখের জ্যোতি
তারেই দেখলি না
মুখের বুলি যে দিলো তোর
তারেই ডাকলি না। (৩১৩)
হাসরের বিচারে তোমার
দিদার যদি পাই আমি
আমার জীবন ধন্য হবে
আর কিছু না চাই আমি। (৩২০)
একুশ আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা এনে দিয়েছে। তাই একুশ একটি জাতীয় চেতনার নাম। একুশের চেতনায় রচিত হয়েছে এক সমৃদ্ধ সাহিত্যের পরিমণ্ডল। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমাÑ সবকিছু মিলে একুশ আমাদের উপহার দিয়েছে এক নিজস্ব সাংস্কৃতিক জগত। ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কিংবা ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিবার চায়’ কিংবা ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাঙালি করি লি/ তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’Ñ ইত্যাদি আরো অসংখ্য গান আমাদের জাতীয় চেতনারই অংশ। লোকমান হোসেন ফকির মায়ের ভাষা, মুখের ভাষার দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন ‘মোরা প্রাণ দিয়ে মাগো তোমারে ডাকার অধিকার করে নিয়েছি’ গানটি। এ গান শুধু তাকে খ্যাতি এনে দেয় নি। এ গানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙালির জাতীয় চেতনা। বায়ান্ন’র পথ বেয়েই লোকমান ফকির সমৃদ্ধ করেছিলেন তার ভেতরের জাতীয়তাবোধের জগত। তাই একুশ বা বায়ান্ন নিয়ে তিনি লিখলেন কালজয়ী কিছু গান। লোকমান ফকিরের একুশের গান থেকে কিছু উদ্ধৃতি :
আবার একুশে এলো
ফাগুনের ফুলে আগুন জালিয়ে
দুঃখীনি মায়েরে কাঁদাতে। (৩২১)
একুশ আসে জানাতে বিশ্বে
ভাষার কতটা মূল্য
ভাষার দাবীতে নাই কোন জাতি
বাঙ্গালীর সমতুল্য। (৩২৫)
নদীর বুকে যে ভাসাতে
মাঝির গলায় গান
সেই ভাষারই লাইগা দিলো
আমার ভাইয়ে প্রাণ। (৩২৯)
শহীদ মিনার ভেঙ্গে মুর্খেরা
নেচেছে জয়োল্লাসে
ভেবেছে ওদের জয়
ওরা তো জানে না শহীদ মিনার
পাথরের গড়া নয়। (৩৩৫)
একজন শিল্পী তার দেশের প্রতিচ্ছবি হৃদয়ে ধারণ করে কাব্য-গানের সুর ও ছন্দে সে ছবি ছড়িয়ে দেয় আপামর মানুষের হৃদয়ে। শিল্পীর কথা আর সুর হৃদয় থেকে হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। দেশ হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের বাহন। তাই দেশকে ভালবাসা মানে নিজেকেই ভালোবাসা। এই দেশপ্রেমের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছেন লোকমান ফকির তার গীতিকবিতায়। এই দেশ আউল বাউল লালনের দেশ। এই দেশের মানুষ আবহমান কাল ধরে সুরে ও ছন্দে নিজেকে খুঁজে নিয়েছে। লোকাচার, লোকঐতিহ্য তথা জনজীবনের নানা অনুষঙ্গ বাক্সময় হয়ে উঠেছে কবির কবিতায়, গায়কের গানে আর শিল্পীর তুলিতে। লোকমান ফকিরের গানে দেশপ্রেমের প্রতিফলন ঘটেছে মূলত গ্রামীণ জনজীবনের বৈচিত্র্যপূর্ণ চিত্র প্রতিফলনের মাধ্যমে। লোকসংস্কৃতির নানা বিষয়-আশয় তিনি যোগ করেছেন তার দেশের গানে। গ্রামীণ জনজীবন তাকে এতোটাই মোহাবিষ্ঠ করে রেখেছিল যে তার দেশাত্ববোধক গান মানেই মাটির গান, পল্লী প্রকৃতির গান আর সাধারণ মানুষের মনের কথা। দেশ, মা, মাটি, মানুষ আর গণমানুষের সুখ-দুঃখ হাসি কান্না নিয়েই লোকমান ফকিরের দেশের গান। দেশকে নিয়ে লিখতে পেরে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছেন। লোকমান ফকিরের দেশাত্ববোধক গান থেকে কিছু পংক্তি :
আমি লিখতে পেরেছি বিশ্বের সেরা
মুক্তির ইতিহাস
আর রক্ত আখরে মুক্তির জয়গান
বাংলাদেশের কবি আমি
সবচে ভাগ্যবান। (৩৩৭)
আঁকা বাঁকা মেঠো পথের পাশে যেথা
দাঁড়ানো রয়েছে সারি সারি
ছোট ছোট ঘর বাড়ী
সেই তো সোনার বাংলা আমার
বাংলা রূপসী সে আমারি। (৩৩৮)
আবার জমবে মেলা বটতলা হাট খোলা
অঘ্রানে নবান্নের উৎসবে
সোনার বাংলা ভরে উঠবে সোনায়
বিশ্ব অবাক চেয়ে রবে। (৩৪০)
এ মাটির মূল্য
আমার প্রাণের চেয়ে অনেক বেশী
এ মাটির অঙ্গে
আমার জীবন মরণ কান্নাহাসি। (৩৪৪)
কত মা হারালো সন্তানে তার
কত বোনে তার ভাই
কত সন্তান হারালো মায়েরে
হিসার যে তার নাই। (৩৪৮)
রূপালী নদী যেথা বয় আঁকা বাঁকা
সোনালী ধানের শীষে প্রান্তর ঢাকা
আকাশ মাথার পরে যেথা নীল নীল
সেইতো আমার সোনার বাংলা
মায়েরই সামিল । (৩৮০)
প্রকৃত শিল্পী তার নিজ সময় ও সমাজের চলমান ঘটনা প্রবাহে নিজেকে উপস্থাপন করলেও তার সৃষ্টিকর্ম সর্বকালীন ও সর্বমানবের জন্য হয়ে থাকে। দেশ কাল ছাড়িয়ে শিল্পী হয়ে ওঠেন সর্বদেশের সর্বকালের। তাই শিল্পী শুধু একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ নন; তিনি বিশ্ববাসীর ও বিশ্বের সম্পদ। একজন শিল্পী সব সময় মানবিকতাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিচার করেন। তাই বিশ্বমানবের জন্যই শিল্পীর পথচলা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লিখিত লোকমান ফকিরের কিছু গান সার্বজনীন মানবিক আবেদনের বহি:প্রকাশ। বিশ্বমানবের কল্যাণকামী, বিশ্বমানবের মুক্তির দিশারীস্বরূপ লোকমান ফকিরের এ রকম কিছু মানবিক আবেদন সৃষ্টিকারী গানের দু-একটি পংক্তি :
অস্ত্রের মদ-মত্ত্বতা ভুলে এসো
এই বিশ্বের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলি।
শ্যামলীম এই সুন্দর পৃথিবীকে
মিলে মিশে সবে মধুময় করে তুলি। (৩৮৪)
আনবিক শক্তির প্রথম শিকার
নাগাসাকী হিরোশিমা থেকে
দুঃসহ স্মৃতি চারণ অবশেষে
ছেড়ে দিলো এক ঝাক শান্তির দূত
ওরা যেন বিশ্বের সবখানে যায়
শান্তির বারতা শোনায়। (৩৮৫)
আমায় একজন সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা
আমায় একজন কালো মানুষ দাও যার রক্ত কালো
যদি দিতে পারো প্রতিদান যা কিছু চাও
হোক অমূল্য পেতে পারো।
উত্তর মেরু হতে দক্ষিণ মেরু যতো মানুষ আছে
পশ্চিম হতে ঐ পূর্ব দিগন্তে যতো মানুষ আছে
একই রক্ত মাংসে গড়া প্রেমপ্রীতিতে হৃদয় ভরা
সেই মানুষে কেনো তোমরা ভিন্ন করো
ভেদাভেদ সৃষ্টি করো। (৩৮৭)
বিশ্ব জুড়ে কান্না
আমি পান্না খুঁজে মরি
সবাই করে যুদ্ধ
আমি ক্ষুব্ধ হয়ে মরি
ডামা ঢোলে যুদ্ধের কান ঝালা পালা
জ্বালারে কেউ শান্তির পিদিম জ্বালা।(৩৯৮)
বিষয়বৈচিত্র্যে লোকমান ফকিরের গান অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। অসংখ্য আধুনিক গানে লোকমান ফকির মানব-মানবীর প্রেমের আকুতি প্রকাশ করেছেন। পল্লীগানে পল্লীবাংলার রূপসৌন্দর্য ও লোকাচারের বর্ণনা দিয়েছেন। মরমী গানে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক, পারলৌকিকতা, খোদাভক্তি ও নবীপ্রেমের মহিমা বর্ণনা করেছেন। ভাষার গান ও দেশের গানে দেশপ্রেমের চিত্র এঁকেছেন। লোকমান ফকির গণমানুষের জন্য গান লিখেছেন। মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন গানের কথায়। লোকসংস্কৃতি লোকমান ফকিরের গানের প্রধান উপাদান। তাই লোকজীবনের বাস্তবচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে তার গানে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তার গান অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, হিরোশিমা-নাগাসাকি ট্র্যাজেডি আর বর্ণবাদের বিপক্ষে তার গান যেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। লোকমান ফকির একজন মানবতাবাদী লোককবি। যেখানেই মানবতা বিপন্ন, সেখানেই তার কলমে উঠে এসেছে প্রতিবাদের ভাষা। বিভিন্ন বিষয়ের ৩৯৯টি গান নিয়ে ‘লোকমান ফকিরের গান’ শিরোনামে গণচিন্তা প্রকাশনী ১৯৮২ সালে প্রকাশ করেছে একটি গানের সংকলনগ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থের প্রাসঙ্গিক কথায় কবি আল মাহমুদ লোকমান ফকিরের গানের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করেছেন। আল মাহমুদের মূল্যায়নের অংশবিশেষ নিম্নরূপ :
- এক সময় আমার ধারণা ছিলো লোকমান হোসেন ফকির দেশাত্ববোধক, প্রেমমূলক ও আধুনিক লিরিক লেখায় ও সুর রচনায় বেশ দক্ষ ব্যক্তি। পরে তার পল্লীগীতি, লোকজ বিষয় নিয়ে লেখা প্রচুর গান এবং মারফতী,মুর্শিদী, ভাটিয়ালী ও জারী-সারি জাতীয় বেশ কিছু রচনার সাথে পরিচিত হয়ে আমি অভিভূত। গীত রচয়িতা হিসেবে তিনি একজন পরিপূর্ণ শিল্পীসত্ত্বা। আমাদের দেশের অনেক আধুনিক কবি ও সাহিত্যিকের যা ভাগ্যে জোটে না, যা আমরা সব সময় সব শিল্পী কামনা করি নিজস্ব স্বতন্ত্র জগত আবিষ্কার, আমার মনে হয় গীতি কবি লোকমান ফকির সেই দুর্লভ ভাগ্যের অধিকারী।
গানের ক্ষেত্রে কবি লোকমান হোসেন ফকিরের একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র জগত আছে। বহু গান ও অসংখ্য কবিতা লিখেও যা এ দেশের অনেক কবি পান নি। লোকমান হোসেনের এই স্বতন্ত্র বিষয় হলো এক ধরনের গভীর জাতীয়তাবোধ। তার গানের শব্দে ও উপমায় অনেক সময় বোঝা যায় যে তিনি যে দেশ ও জাতির মধ্যে বসবাস করছেন তাদের সম্পর্কে তার পরিচ্ছন্ন ইতিহাস জ্ঞান আছে। এ দেশের নর-নারীর সম্বন্ধসূত্র, তাদের প্রেম-বিরহ, কামনা-বাসনা, লোভ ও লালসা তার গানের কথায় অকপট মাধুর্যে কবিত্বমণ্ডিত ভাষা পেয়েছে যা একজন কবিকে নিরবধি কালের চক্রান্তও পরাজিত করতে পারে না। গীতিকবি হিসেবে লোকমান হোসেন ফকিরের এখানেই সার্থকতা।
লোকমান হোসেন ফকির ১৯৬০ সালে বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে বেতার ও টেলিভিশনে গীতিকবি ও সুরকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে তার কবিতা, গান ও সুর অনেক প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি ঘূর্ণীঝড়, মলুয়া, তিতাস একটি নদীর নামসহ বহু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক, গীতিকার, প্রযোজক ও পরিবেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘চরিত্রহীন’ ছায়াছবির সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন। উপমহাদেশের খ্যাতিমান সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা ও ঊষা মুঙ্গেশকর লোকমান ফকিরের কয়েকটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘আমায় একটি সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা’ লোকমান ফকিরের কথা ও সুরে ভুপেন হাজারিকার গাওয়া এই গানটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় অনূদিত ও প্রচারিত হলে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেন।
লোকমান হোসেন ফকির প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর পলশিয়া রানী দিনমণি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। সিরাজগঞ্জ বি এল কলেজ থেকে আই এ পাস করে ভর্তি হন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে। এখানে কিছুদিন পড়াশুনার পর কর্মমুখী হয়ে পড়েন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর বিচরণ ছিল। ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাহী কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘদিন এ পদে বহাল ছিলেন। জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এর প্রধান ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তার সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ ললিতকলা একাডেমী, লোকসংগীত গোষ্ঠী, গীতিকবি সংসদ, সোনালী সপ্তক ও গণচিন্তা প্রকাশনী দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার মাধ্যমে। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। গ্রুপ কোম্পানি ‘সীফস’ বাংলাদেশ লিমিটেডের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। সমাজসেবা, শিক্ষাসেবা ও বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন। চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন শমসের ফকির মহাবিদ্যালয় (১৯৮৬) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মমতাজ ফকির উচ্চ বিদ্যালয় ও বেগম মমতাজ ফকির বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চরাঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষা ও নারী শিক্ষার পথ সুগম করেছেন। আর্তমানবতার সেবায় তার অবদান আজ স্মরণ করে তার এলাকার লোকজন।
গীতিকবি লোকমান হোসেন ফকিরের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪ টি। ১. আমি দিন গুনছি (কাব্য), ২. লোকমান ফকিরের গান (গানের সংকলন), ৩. জীবন যেমন (কাব্য) ও ৪. ভাবনা পারাপার। একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক; চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক; একজন রাজনীতিবিদ, একজন ব্যবসায়ী, একজন সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী; সর্বোপরি একজন দেশপ্রেমিক মানবতাবাদী লোকমান হোসেন ফকির তাঁর কর্মের মাঝে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে।
আলী রেজা
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ওজি/প্রটা

