বিশেষ প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলের গজারী বনে অগ্নিকান্ডে কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদ ভস্মীভূত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য। বেহাত হচ্ছে বনভূমি। কিন্তু বন অপরাধ দমনে সরকারি উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান নয়।
জানা যায়, টাঙ্গাইল বন বিভাগের ৮টি রেঞ্জে ১লক্ষ ২২ হাজার একরে বনাঞ্চল বিস্তৃত। গজারীর পাশাপাশি কাইকা, সিধা, আজুলি, জিগা, ভূতুম, জারুল, আনাই, হরিতকিসহ ৫০৩ প্রজাতির বৃক্ষ, ভেষজ উদ্ভিদ ও গুল্মলতাদির দেখা মেলে। সর্বশেষ তথ্যে, প্রায় ৪৫ হাজার একর বনভূমি জবরদখলে গেছে। সরকারিভাবে ৩৫ হাজার একর আর বেসরকারি সংস্থা সেডের তথ্যে ২০ হাজার একরে গজারী বন রয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত অগ্নিকান্ড আর জবরদখলে গজারী বন এখন বিলুপ্তির পথে। এবারের টানা খরায় ধলাপাড়া, বহেড়াতলী, বাঁশতৈল, দোখলা এবং জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জে অগ্নিকান্ডের ঘটনা বেশি ঘটছে।

প্রায় চারশ একর বনাঞ্চল এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে একটি বেসরকারি সংস্থা জানায়। শুধুমাত্র বহেড়াতলী রেঞ্জে এক মাসে একডজন, ধলাপাড়া রেঞ্জে তিনটি এবং দোখলা ও জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জে ছোটবড় ২৩টি অগ্নিকান্ড ঘটে। গজারীবনে অগ্নিকান্ডে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ‘পরিবেশ ও প্রতিবেশ’ নামক এক সংস্থার গবেষণায় বলা হয়, ‘বসন্তে পর্ণমোচী বৃক্ষের শুকনা পাতার পুরু আস্তরন পড়ে বনতলে। ফায়ার বে সিষ্টেম না থাকায় আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এ আগুনে শুধু গাছপালা, গুল্মলতাদি ও ভেষজ উদ্ভিদ-ই- পোড়েনা, বণ্য প্রাণী, পশুপাখি ও মৌমাছির আবাসস্থল ধ্বংস হয়। মাটির নিচের বহু কীটপতঙ্গ সমূলে বিনাশ হয়। সর্বোপরি বনের ইকোসিষ্টেম ধ্বংস হয়।’ গত শুক্রবার দোখলা সদর বিটের পীরগাছায় অগ্নিকান্ডে ২৫ একর বেঁত ও গজারী বন পুড়ে যায়। আগুন নেভাতে গেলে ভূমি খেকোরা বনকর্মী ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে হামলা চালায়।
গত ২২ এপ্রিল একই বিটের অরনখোলায় সুফল প্রকল্পের ৩০ একর বনে দুবৃর্ত্তরা আগুন দিলে ৫ হাজার গাছপালা পুড়ে যায়। গত ৬ এপ্রিল লহুরীয়া বিটে অগ্নিকান্ডে দেড় একর বন পুড়ে খাক হয়। পরিবেশ কর্মী আবু রায়হান খান জানান, বনে অগ্নিকান্ডের নেপথ্যে রয়েছে ভূমি দস্যুরা। এরা স্থানীয় লেবার শ্রেণীকে দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে আগুন লাগায়। বিনিময়ে পুড়ে যাওয়া গাছপালা থেকে লাকড়ি পায়। এরপর বনের বড় গাছ কেটে নেয় দুর্বৃত্তরা।
সর্বশেষ বিরান বনভূমি দখলে নেয় ভূমি দস্যুরা। এরা বনকর্মীদের ইনাম দিয়ে দখলী ভূমিতে লাগায় কলা আর আনারস চারা। বিগত তিন বছরে শুধু জাতীয় সদর উদ্যান, মধুপুর ও দোখলা রেঞ্জের প্রায় চার হাজার একর বনভূমি এভাবে বেহাত হয়েছে। মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা গ্রামের অবিনাশ কোচ জানান, বনে আগুন দিলে চার পক্ষের লাভ। যেমন লেবাররা লাকড়ি পায়, চোরেরা গাছ পায়, ভূমি দস্যুরা জমি পায় আর বনকর্মীরা ইনাম পায়। এই যে, চার দুষ্টচক্র তাদের রোখার কেউ নেই।
এদিকে মধুপুর বনাঞ্চলের ২১ জন প্রভাবশালী ভূমি দস্যু, যাদের কবজায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর বনভূমি, যাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয় চার বছর আগে, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠিগত প্রভাব থাকায় বনভূমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করা যায়নি। এসব রুইকাতলার দেখাদেখি এখন ছোটখাটো ভূমি দস্যুরাও বনে আগুন দিয়ে বন বিনাশ করছে। লহুরিয়া বিট অফিসার শাহ আলম জানান, স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির কেউ কেউ বন অপরাধের সাথে জড়িত। মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারি বন সংরক্ষক আশিকুর রহমান জানান, অগ্নিকান্ডের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমান এখনো বলা যাচ্ছেনা। তবে বনভূমি জবরদখল এবং অগ্নিকান্ড বন্ধে তারা সচেষ্ট রয়েছেন।
টাঙ্গাইল বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদুজামান জানান, গজারী বনে আগুন লাগলে লাভ ক্ষতি দুটোই হয়। যেমন বৃষ্টির পর পুড়ে যাওয়া বনতলে দ্রুত গজারী গাছের রিজেনারেশন হয়। তবে পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও প্রাণবৈচিত্র্যের বেশ ক্ষতি হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্টাফ না থাকায় বনে অগ্নি সংযোগ এবং বনভূমি জবরদখল ঠেকানো কঠিন হচ্ছে।
ওজি/প্রটা
