পুলিশের গুলিতে নিহত ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় মা! খুঁজে পায়নি স্বজনরা

বিশেষ প্রতিবেদক: কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে হারিয়ে মায়ের কান্না আর আহাজারি যেন থামছেই না গর্ভধারিনী মায়ের। ঘটনার ১০দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও ছেলের মরদেহ খুঁজে পায়নি বাবা ও স্বজনরা। একমাত্র ছেলে হৃদয় (২০) বিজয় মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় বলে দাবী পরিবারের। নিজের পড়াশুনা খরচ ও বাবা-মায়ের মুখে ভাত তুলে দিতে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অটোরিক্সা চালাতো হৃদয়। হৃদয়কে পুলিশ গুলি করে মারা সেই দৃশ্য আশপাশের মানুষজন ভিডিও ধারণ করে। সেই ধারণকৃত ভিডিও দেখে স্বজনরা সনাক্ত করেছে গুলিবৃদ্ধ মরদেহটি হৃদয়ের। তবে হৃদয়ের মরদেহ কোথায় রেখেছে পুলিশ তা এখনও পাওয়া যায়নি। হৃদয় টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর ইউনিয়নের আলমনগর মধ্যপাড়া গ্রামের ভ্যান চালক লাল মিয়া ও রেহেনা বেগমের ছেলে।

 

সরেজমিনে আলমনগরে গিয়ে দেখা গেছে, একমাত্র ছেলে হৃদয়কে হারিয়ে পাগল প্রায় মা রেহেনা বেগম। বাড়িতে রাখা ছেলের জামা-কাপড়, খেলাধুলায় পাওয়া বিভিন্ন পুরস্কার হাতে নিয়ে কাদঁছেন আর বিলাপ করছেন। প্রতিবেশিরা তাকে শান্তনা দিচ্ছেন। তবুও তিনি কেঁদে যাচ্ছেন। পাশেই তার স্বামী দাড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন। শোকে পরিণত হয়েছে বাড়িটি। হৃদয় বাড়ির একটি জরাজীর্ণ ঘরে থাকতো। তার বোন জামাইয়ের দেয়া একটি ঘরের একপাশে থাকে তার বাবা-মা। সেই ঘরেই নিহত হৃদয়ের জামা-কাপড় ও বিভিন্ন জিনিষপত্র রয়েছে। প্রতিদিনই ওই বাড়িতে লোকজন ভিড় করছে।

 

পরিবারের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, হৃদয় গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ডিগ্রী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। তার দুইবোন অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তার বাবা লাল মিয়া এলাকায় ভ্যান চালাতো। তবে অসুস্থ্য থাকার কারণে বেশ কয়েকমাস হল তিনি আর ভ্যান চালাতে পারেন না। এই অবস্থায় নিজের পড়াশুনার খরচ যোগানো ও সংসার চালানোর জন্য কর্মের সন্ধানে প্রায় তিন মাস আগে গাজীপুরের কোনাবাড়ি যায়। পরে সেখানে একটি অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে চালাতো সে। এরপর গত ৫ আগষ্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন বিকেলে কোনাবাড়ির কাশেমপুর সড়কের মেট্রো থানার শরীফ মেডিকেলের সামনে আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে গিয়েছিল হৃদয়। এসময় পুলিশ মিছিলে গুলি ছোড়ে। ভয়ে হৃদয় একটি বাড়ির পাশে লুকিয়ে ছিল। সেখান থেকে পুলিশ তাকে ধরে সড়কে নিয়ে যায় এবং মারধর করে। পরে হঠাৎই তাকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলে। এরপর আর তার মরদেহ মর্গেসহ বিভিন্নস্থানে খুঁজে পায়নি স্বজনরা।

 

ওইদিনে আশপাশের বাসা থেকে ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, ১০-১২জনের পুলিশ সদস্য এক যুবককে ধরে সড়কের উপর নিয়ে লাঠিপেটা করছে। এরপর তাকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে মারধর করছে। এরমধ্যে হঠাৎ করেই একজন পুলিশ সদস্য সামনা সামনি গুলি করে। এতে মুহুর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে চলে যায়। এরপর আবার চারজন পুলিশ সদস্য দুইজন হাত দুইজন পা ধরে তাকে চাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ভিডিও দেখা গেছে, তিনজন পুলিশ সদস্য তাকে ছিচড়িয়ে একটি গলির ভিতর নিয়ে যাচ্ছে। এসময় আশপাশে প্রচন্ড গুলির শব্দ যাচ্ছে। এরপর ওই তিনজন তার মরদেহ ফেলে চলে যায়। তার একটু পর আবার দুইজন এসে তার মরদেহ গলির ভিতর নিয়ে যাচ্ছে।

 

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী রবিন বলেন, কোনাবড়ীতে আমরা বিজয় মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। মেট্রো থানার সামনেই আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম। এসময় পুলিশ আমাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ালশেল ও গুলি করে। এসময় অনেকেই গুলিবৃদ্ধ হয়েছে। এসময় আমরা একপাশে ছিলাম। আর হৃদয় ছিল অন্যপাশে। একপর্যায়ে হৃদয় একটি বিল্ডিংয়ের পাশে লুকিয়ে ছিল। পরে সেখান থেকে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে সড়কের উপর নিয়ে যায়। হয়ত মনে করেছি মারধর করে ছেড়ে দিবে কিন্তু তারা গুলি করে হত্যা করেছে। এসময় চতুর্দিকে গুলি করা হয়। ভয়ে এগিয়ে যেতে পারিনি। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম তার মৃত্যু। ভেবেছিলাম পরিবেশ শান্ত হলে তার মরদেহ আনতে যাবো। পরে পুলিশ তার মরদেহ নিয়ে চলে যায়। ওইদিন রাত ১২টার পর যেখানে তাকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে শুধু তার রক্তাক্ত লুঙ্গি পাওয়া যায়। তবে পুলিশ মরদেহ কোথায় রেখেছে সেটা আর পাওয়া যায়নি। পরে আশপাশে খোজঁখবর নিতে গেলে কয়েকজনের কাছে তাকে হত্যা করার ভিডিও পাই।

 

আরেকজন মো. হামিদ বলেন, কোনাবাড়ীতে আমরা দোকান রয়েছে। মিছিলের আগেই আমার দোকানের সামনেই ছিল। এসময় তার বোন জামাইও ছিল। তাদের সেখানে যেতে বারণ করেছিলাম। তারপরও তারা আনন্দ মিছিলে যোগদান করেছে। বোনের জামাই দুর থেকে দেখেছে কিভাবে হৃদয়কে গুলি করে মেরেছে পুলিশ। কিন্তু ভয়ে কেউ সামনে যাওয়া সাহস পায়নি। যারা হত্যা করেছে তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হোক। হৃদয়ের মরদেহ যেন তার পরিবার ফিরে পায়।

 

হৃদয়ের বোন জিয়াসমিন আক্তার বলেন, ঘটনার দিন বিকালে ভাইয়ের সাথে সর্বশেষ কথা হয়েছে ফোনে। ভাইকে বলেছি তুমি নিরাপদে থাকে বাসায় ফিরে যাও। তাকে আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। এর প্রায় আধাঘন্টা পরই আমার স্বামী ফোনে জানালো আমার ভাই বেঁচে নেই। পরে ভাইয়ের ফোনে ফোন দিলে অন্য একজন ধরে বলে ফোনটি তিনি কুড়িয়ে পেয়েছেন। পুলিশ ধরে নেয়ার পরই তার পরনের লুঙ্গি খুলে ফেলেছিল। পরনে শুধু শর্ট প্যান্ট ছিল। রাত ১২টার পর স্বাভাবিক হলে তার মরদেহ আর পাওয়া যায়নি। ভাইয়ের আশা ছিল লেখাপড়া করে চাকরি করবে। বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দিবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পুলিশ শেষ করে দিল। যারা ভাইকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই। দেশ স্বাধীনে যেন শহীদের খাতায় ভাইয়ের নাম থাকে।

 

হৃদয়ের মা রেহেনা বেগম বলেন, আমাদের মুখে খাবার ও পড়াশুনা করার জন্য কোনাবাড়িতে কাজ করতে গেছিল। ১০ হাজার টাকা কিস্তি তুলে ছেলেকে দিয়েছি গাড়ি চালানো শিখতে। ছেলে গাড়ি চালাবে। সেই কিস্তির টাকা কে দিবে। আমার ছেলেডাকে মাইরা ফেলেছে পুলিশ গুলি করে। আমার ছেলের মরদেহ ফিরত দেন আমি দেখবো। আমি বিচার চাই।

 

হৃদয়ের বাবা লাল মিয়া বলেন, বড় মেয়ের জামাইয়ের একটি ঘরে আমি স্ত্রী নিয়ে থাকি। ছেলে একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকে। ছেলেটা কোনাবাড়ীতে অটোরিক্সা চালাতো। ঘটনার দিন তাকে বাড়িতে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু ছেলে বললো, ভাইয়ের (বোন জামাই) সাথে যাবো। বাবাডা আর আসলো না। আমার ছেলের মরদেহ ফিরত চাই।

 

ঘটনাটি গোপালপুরে না হওয়ায় এবং নিহত হৃদয়ের মরদেহ না পাওয়ার কারণে এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

ওজি/প্রটা